আগরতলা, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : স্বেচ্ছা রক্তদান মানুষের সেবা করার এক মহৎ ও পবিত্র মাধ্যম। একজন মানুষের স্বেচ্ছায় দান করা রক্ত অন্য একজন মুমূর্ষু মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে। তাই মানবকল্যাণের এই মহান কাজে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে রক্তদান সম্পর্কে আরও বেশি সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।শনিবার আগরতলার ধলেশ্বরস্থিত রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের উদ্যোগে আয়োজিত স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী (ডা.) মানিক সাহা।মুখ্যমন্ত্রী বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের সেবার মধ্যেই ঈশ্বরের সেবা নিহিত রয়েছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করাই প্রকৃত মানবসেবা। রক্তদানের মাধ্যমে সরাসরি একজন মুমুর্ষু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়। এর থেকে বড় মানবসেবার উদাহরণ আর কি হতে পারে। প্রত্যেক সুস্থ ও সক্ষম নাগরিককে স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসার জন্য তিনি আহ্বান জানান।মুখ্যমন্ত্রী ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগোয় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক ভাষণের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, স্বামী বিবেকানন্দের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ও সনাতন ভাবধারাকেই বিশ্বের সামনে তুলে ধরেনি, একই সঙ্গে বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মানবতার এক মহান বার্তা দিয়েছিল। আজও স্বামীজির সেই চিন্তাধারা সমগ্র বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’-এর ভাবনার মধ্যেও স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বমানবতার সেই আদর্শ প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন।
রক্তদানের সামাজিক ও মানবিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রক্তের কোনও ধর্ম, বর্ণ বা জাত হয় না। একজন রক্তদাতা জানেন না তাঁর দান করা রক্ত কোন মানুষকে দেওয়া হবে। একইভাবে একজন রক্তগ্রহীতাও জানেন কার দান করা রক্তের মাধ্যমে তিনি নতুন জীবন ফিরে পেলেন। রক্তদান তাই মানুষের মধ্যে এক গভীর মানবিক বন্ধন তৈরি করে। একজন রক্তদাতার দান করা রক্ত বিভিন্ন উপাদানে বিভক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে একজনের রক্তদান একাধিক মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই কারণেই নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শকে জীবনে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধি নয়। সমাজের দুর্বল, অসহায় পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে কাজ করার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে। কোনও ধরনের ছলচাতুরি বা বাহ্যিক আড়ম্বরের মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সম্ভব নয়। নিষ্ঠা, সততা এবং সেবার মানসিকতা নিয়েই মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই আদর্শকে সামনে রেখে সকলকে সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করা উচিৎ।
রামকৃষ্ণ মিশনের বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রামকৃষ্ণ মিশন শুধু আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রামকৃষ্ণ মিশন দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। রাজ্যে ভয়াবহ বন্যার সময়ও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী ও স্বেচ্ছাসেবকগণ যেভাবে ত্রাণ ও সেবামূলক কাজে এগিয়ে এসেছেন সেটা সত্যিই গর্বের বিষয়।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রাজ্য সরকার ও রামকৃষ্ণ মিশনের যৌথ উদ্যোগে বৈদেশিক ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের রাজ্যেই এই প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই ধরনের দক্ষতা তাদের ভবিষ্যতে আরও বেশি সুযোগ তৈরি করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, মানুষের সংকটাপন্ন মুহূর্তে রক্তের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। রাজ্যে বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সাফল্যকে ধরে রাখতে জনসচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। রাজ্যে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হচ্ছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। রক্তদাতাদের উৎসাহিত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যারা স্বেচ্ছায় রক্তদান করছেন তারা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য একটি মহান কাজ করছেন। রক্তদানের মাধ্যমে একজন মানুষ কোনও প্রত্যাশা ছাড়াই অন্য একজন মানুষের জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসেন। এই মানবিক চেতনা সমাজে বিরাট ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে মুখ্যমন্ত্রী রক্তদান শিবির পরিদর্শন করেন এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানকারীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের উৎসাহিত করেন।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ধলেশ্বর রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পাদক স্বামী অমর্ত্যানন্দ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ধলেশ্বর রামকৃষ্ণ মিশনের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তথা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি স্বপন চন্দ্র দাস। অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার সহ রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী এবং স্বেচ্ছাসেবকগণ।






