30 C
Agartala
Saturday, September 12, 2026

Buy now

spot_img

প্রতিভা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতাকে জয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও সাফল্য অর্জন করা সম্ভব

আগরতলা, ১২ আগস্ট ২০২৬ :গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমস-এ অস্মিতা দে-র সাফল্য এবং দেশের প্রথম জুডোকা হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি ত্রিপুরার এবং আমাদের দেশেকেও গৌরবান্নিত করেছে। বুধবার  আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে যুববিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত কমনওয়েলথ গেমস-এ স্বর্ণপদক জয়ী ত্রিপুরার কৃতি জুডোকা অস্মিতা দে’র সংবর্ধনা জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন। আজ এই অনুষ্ঠানে অস্মিতা দে-র হাতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক পুরস্কারের চেক তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা। একইসঙ্গে তাঁর পরিবারের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জমি দানের কাগজ তুলে দেওয়া হয়।অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এতদিন ত্রিপুরার মানুষ ‘গোল্ডেন গার্ল’ হিসেবে দীপা কর্মকারকে চিনতেন এবং তাঁর সাফল্যে গর্ব করতেন। আজ অস্মিতা দে সেই তালিকায় দ্বিতীয় নাম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনীয়া মহকুমার সোনাইছড়ি গ্রামের এক অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে অস্মিতা কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ত্রিপুরার নাম উজ্জ্বল করেছেন। তাঁর এই সাফল্য সমগ্র রাজ্যের জন্য গর্বের বিষয়। অস্মিতার জীবনসংগ্রামের কথা স্মরণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অস্মিতার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি তাঁর বাবার কঠিন জীবনসংগ্রামের কথা জানতে পারেন। অস্মিতার সাফল্যের পিছনে তাঁর পরিবারের ত্যাগ ও সংগ্রামের কথাও মুখ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। অস্মিতার বাসস্থানের সমস্যার কথা জানতে পেরে মুখ্যমন্ত্রী এবং ক্রীড়ামন্ত্রী টিঙ্কু রায় তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ তাঁর পরিবারের জন্য জমি প্রদানের সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। বর্তমানে অস্মিতা উত্তরপ্রদেশের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অধীনে কর্মরত থাকলেও ত্রিপুরা সরকার সবসময় তাঁর পাশে থাকবে বলে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা তাঁকে আশ্বস্থ করেন।রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোর উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, একটা সময় ত্রিপুরায় খেলোয়াড়দের জন্য ক্রীড়া পরিকাঠামোর অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিলো। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। রাজ্যে আধুনিক সিন্থেটিক ফুটবল মাঠ, হকি মাঠ এবং উন্নতমানের স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছে।ত্রিপুরার ক্রীড়া পরিকাঠামোর উন্নয়ন দেখে বিভিন্ন রাজ্যের খেলোয়াড়রাও মুগ্ধ হচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্য সরকার সফল ক্রীড়াবিদদের সম্মানও জানাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজ্য সরকার শুধু বর্তমান প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের উৎসাহিত করছে না, প্রথিতযশা ও প্রয়াত ক্রীড়াবিদদেরও যথাযোগ্য সম্মান জানাচ্ছে। অনেক ক্রীড়াবিদদের নামে বিভিন্ন ক্রীড়া পরিকাঠামোর নামকরণ করা হয়েছে। যা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।পাশাপাশি অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত মন্টু দেবনাথ, কল্পনা দেবনাথ এবং সোমদেব দেববর্মনের অবদানের কথাও মুখ্যমন্ত্রী তুলে ধরেন।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধথাকলে একজন মানুষের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। সুস্থ শরীরের মধ্যেই সুস্থ মনের বাস। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ত্রিপুরাতে মেধার অভাব নেই। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ক্রীড়া বিভাগে ত্রিপুরার খেলোয়াড়রা তাঁদের সুনাম কুড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশ বিদেশে সমাদৃতও হয়েছে। বর্তমান সময়ে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করারও সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, অস্মিতার এই সাফল্য ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা প্রতিভাবান ছেলে-মেয়েদের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। প্রতিভা ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতাকে জয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। ত্রিপুরার একটি গ্রামীণ পরিবার থেকে উঠে আসা অস্মিতার এই সাফল্য নারী ক্ষমতায়নেরও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুখ্যমন্ত্রী আগামী দিনে অস্মিতার আরও সাফল্য কামনা করেন।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ক্রীড়ামন্ত্রী টিঙ্কু রায়। তিনি বলেন, অস্মিতা দে-র সাফল্যের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। ২০১৮ সালের থেকে রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। খেলোয়াড় হওয়ায় ক্রীড়া উন্নয়নের কাজ অনেক সহজ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ  করেন।ক্রীড়ামন্ত্রী বলেন, একটা সময় রাজ্যে ইনডোর গেমসের জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ছিল না। বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় আধুনিক ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। ভোলাগিরি স্পোর্টস ময়দানে একটি আধুনিক স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের অনুমোদন ও অর্থ ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে। দ্রুত এর নির্মাণকাজ শুরু হবে বলেও তিনি জানান। রাজ্যের ভবিষ্যৎ ক্রীড়া পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ক্রীড়ামন্ত্রী বলেন বলেন, প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ জন প্রতিভাবান খুদে খেলোয়াড়কে ‘মুখ্যমন্ত্রী ট্যালেন্ট সার্চ স্কিম’-এর মাধ্যমে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। টেনিস কোর্ট, সিন্থেটিক ফুটবল মাঠ থেকে শুরু করে আধুনিক সুইমিং পুল নির্মাণের মাধ্যমে রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। অস্মিতার মতো কৃতি খেলোয়াড়দের সাফল্য আগামী প্রজন্মকে আরও উৎসাহিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন এবং অস্মিতার ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করেন।অনুষ্ঠানে কমনওয়েলথ জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদকজয়ী অস্মিতা দে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, স্বর্ণপদক জয়ের চেয়েও নিজ রাজ্যে ফিরে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সম্মান তাঁকে অনেক বেশি আপ্লুত করেছে। তাঁর সাফল্যের যাত্রায় ত্রিপুরা স্পোর্টস স্কুলের অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি। জুডু জীবনের শুরুর মুহূর্তের প্রশিক্ষকদের পাশাপাশি ভোপালে তাঁর কোচ যশপাল সোলাঙ্কির অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন অস্মিতা। কিছুদিন আগে তাঁর পিতাকে হারানোর ব্যথাও তিনি উল্লেখ করেন। পরিবারের জন্য জমি এবং আর্থিক পুরস্কার প্রদানের জন্য মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানার খুব প্রয়োজন ছিল, যা আজ পূরণ হলো। আগামী প্রজন্মের উদীয়মান খেলোয়াড়দের উদ্দেশে অস্মিতা বলেন, কঠোর পরিশ্রম, নিয়মশৃঙ্খলা এবং পরিবারের কথা শুনে চললে যেকোনও বড় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। নিজের সাফল্যের জন্য প্রশিক্ষক, পরিবার এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আগামী দিনে আরও ভালো পারফরমেন্স করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।অনুষ্ঠানে অস্মিতা দে-র সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জিমন্যাস্ট পদ্মশ্রী দীপা কর্মকার। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০১৪-১৫ সালে অস্মিতা যখন প্রথম ত্রিপুরা স্পোর্টস স্কুলে প্রশিক্ষণ শুরু করেছিল, তখন থেকেই তার মধ্যে কিছু করে দেখানোর অদম্য জেদ দেখা গিয়েছিল। আজকের এই সংবর্ধনা অস্মিতার দীর্ঘ পথচলার কেবল শুরু মাত্র বলেও তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, অস্মিতার এই সফলতা রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানে অস্মিতা দে, তাঁর কোচ যশপাল সোলাঙ্কি (হাই পারফরম্যান্স ডিরেক্টর, স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া) এবং তাঁর পূর্বতন প্রশিক্ষকদের আগরতলা পুরনিগম সহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অস্মিতার হাতে ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক পুরস্কারের চেক তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। একইসঙ্গে তাঁর পরিবারের জন্য জমি বরাদ্দের অনুমোদনপত্র তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, যুববিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের সচিব তাপস রায়, দপ্তরের অধিকর্তা এল. ডারলং প্রমুখ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles